ছবিঃ সংগৃহীত
পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত ভারতীয় চলচ্চিত্রের খ্যাতিমান অভিনেতা বিশ্বনাথ ‘নানা’ পাটেকার মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে গোয়ার একটি হাসপাতালে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগে, গত ৪ অক্টোবর গোয়ার ডোনা পাওলায় একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন তিনি—সেটিই তাঁর জীবনের শেষ প্রকাশ্য অনুষ্ঠান হয়ে থাকল।
সেদিন ডোনা পাওলার ‘তাজ সিদাদে দে গোয়া’-তে সম্রাট ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল, স্টেট-১-এর নতুন পরিচালনা পর্ষদের অভিষেক অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে যোগ দেন নানা পাটেকার। অনুষ্ঠানে ২০২৬-২৭ মেয়াদে রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাজশ্রী এ. খান্ডেপারকার।
বার্তা সংস্থা পিটিআইয়ের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সাদা কুর্তা পরে ও গলায় সাদা গামছা জড়িয়ে নানা পাটেকার উপস্থিত সবার উদ্দেশে বক্তব্য রাখছেন। গোয়ার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মনোহর পারিকরকে স্মরণ করে তিনি রাজনীতিক হিসেবে তাঁর কাজের ধরনের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে মারাঠি ভাষায় মৃত্যুর চিরন্তন সত্য নিয়ে আবেগময় কথা বলেন নানা পাটেকার। তিনি বলেন, ‘একদিন আমাদের সবাইকে চলে যেতে হবে। কাল আমি এখানে থাকব কি না, তা-ও জানি না। প্রতিটি মানুষের জীবনই শেষ পর্যন্ত এই এক চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছাবে। তবে সেই মুহূর্ত আসার আগে আমাকে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—আমি যা করতে চাই, তা কি সত্যিই করতে পারছি?’ মৃত্যুর ঠিক চার দিন আগে বলা এই কথাগুলো এখন সবার মনে গভীর বেদনা জাগাচ্ছে।
মণিপাল হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক ড. শেখর সালকার জানিয়েছেন, হাসপাতালে নেওয়ার পর একটানা ৪৫ মিনিট সিপিআর দেওয়া হলেও নানার হৃৎস্পন্দন ফিরিয়ে আনা যায়নি। ঘটনাটি ইতোমধ্যে মেডিকো-লিগ্যাল কেস হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে এবং নিয়ম মেনে তাঁর মরদেহের ময়নাতদন্ত হবে।
পর্দায় নানা পাটেকারকে সর্বশেষ দেখা গেছে ‘ও’রোমিও’ চলচ্চিত্রে। এ ছবিতে তাঁর সঙ্গে অভিনয় করেছেন শাহিদ কাপুর, তৃপ্তি দিমরি, অবিনাশ তিওয়ারি ও দিশা পাটানি।
বিশ্বনাথ পাটেকারের জন্ম ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি, মহারাষ্ট্রে। ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে নানা পাটেকার নামেই তিনি নিজেকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। কয়েক দশক ধরে হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে তাঁর তীব্র, শক্তিশালী ও বাস্তবনিষ্ঠ অভিনয় দর্শকদের মোহিত করে রেখেছিল। তাঁর সংলাপ বলার ভঙ্গি এতটাই স্বতন্ত্র ও নাটকীয় ছিল যে অনুকরণশিল্পীদের (মিমিক্রি আর্টিস্ট) কাছে তা হুবহু নকল করতে পারা ছিল বিরাট কৃতিত্বের বিষয়।
১৯৭৮ সালে ‘গমন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে হিন্দি সিনেমায় যাত্রা শুরু করেন নানা পাটেকার। তবে তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয় ‘সালাম বোম্বে’ ও ‘পারিন্দা’, যার মধ্য দিয়ে মূলধারায় তাঁর শক্ত অবস্থান তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে ‘তিরঙ্গা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ‘যশবন্ত’, ‘আব তাক ছাপ্পান’, ‘অপহরণ’ ও ‘রাজনীতি’র মতো একের পর এক সুপারহিট ও ব্যবসাসফল ছবি উপহার দেন তিনি।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মারাঠি থিয়েটার ও নাটকেও সমানভাবে সক্রিয় ছিলেন নানা পাটেকার। ১৯৯১ সালে ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ সিনেমা পরিচালনা করে নির্মাতা হিসেবেও আত্মপ্রকাশ ঘটে তাঁর। গম্ভীর ও আক্রমণাত্মক চরিত্রের গণ্ডি পেরিয়ে ‘ওয়েলকাম’ ফ্র্যাঞ্চাইজিতে তাঁর আইকনিক ‘উদয় শেট্টি’ চরিত্র দর্শকদের প্রচুর হাসিয়েছিল, যা পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয় মিমে রূপ নেয়।
শিল্প ও চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ পান নানা পাটেকার। কর্মজীবনে তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বহু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি। শুধু রুপালি পর্দাতেই নয়, বাস্তব জীবনেও তিনি ছিলেন মানবদরদি। নানা সামাজিক কাজে ও কৃষকদের সহায়তায় সব সময় এগিয়ে এসেছেন। পাকিস্তান থেকে গোলাবর্ষণের সময় ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ান এবং নিজের এনজিওর মাধ্যমে তাদের আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করেন।
সূত্র: এনডিটিভি